

মা—একটি ছোট শব্দ, অথচ এর গভীরতা আকাশের চেয়েও বিস্তৃত। একজন মা সন্তানের জন্য নিজের সুখ, স্বপ্ন, সময় এবং জীবন উৎসর্গ করেন। কিন্তু সমাজের এক নির্মম বাস্তবতা হলো, অনেক সময় সেই মায়েরাই বার্ধক্যে এসে সবচেয়ে বেশি অবহেলিত হন। বিশেষ করে উচ্চবিত্ত ও শিক্ষিত সমাজের কিছু ঘটনার দিকে তাকালে দেখা যায়, অর্থ, পদমর্যাদা ও শিক্ষার উচ্চতায় পৌঁছেও অনেক সন্তান মানবিকতার পরীক্ষায় ব্যর্থ হচ্ছে।
সম্প্রতি বাংলাদেশে একটি হৃদয়বিদারক ঘটনা দেশবাসীকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এক বৃদ্ধা মায়ের মৃত্যুর কয়েক দিন পর তার মরদেহে পোকা ধরার ঘটনা সামনে আসে। আরও বিস্ময়ের বিষয় হলো, তার সন্তানদের মধ্যে একজন ছিলেন যুগ্ম-সচিব এবং আরেকজন উচ্চশিক্ষিত শিক্ষক। সমাজে প্রতিষ্ঠিত, সম্মানিত ও শিক্ষিত হিসেবে পরিচিত এই সন্তানরা কীভাবে নিজেদের মায়ের খোঁজখবর নিতে ব্যর্থ হলেন—সেই প্রশ্ন আজ বিবেকবান মানুষকে নাড়া দিচ্ছে।
এই ঘটনা শুধু একটি পরিবারের ট্র্যাজেডি নয়; এটি আমাদের সমাজের একটি গভীর সংকটের প্রতিচ্ছবি। আমরা উন্নয়নের কথা বলি, উচ্চশিক্ষার কথা বলি, আধুনিকতার কথা বলি। কিন্তু যদি একজন মা জীবনের শেষ সময়ে একাকীত্ব, অবহেলা ও অসহায়ত্বের মধ্যে দিন কাটান, তাহলে সেই উন্নয়নের মূল্য কতটুকু?
একজন মা তার সন্তানকে বড় করতে কত কষ্ট করেন, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। সন্তানের জ্বর হলে রাত জেগে থাকেন, নিজের প্রয়োজন বিসর্জন দিয়ে সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলেন। সন্তান যখন সফল হয়, তখন সেই সাফল্যের পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান থাকে মায়ের ত্যাগের। অথচ অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, সন্তান প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর মা হয়ে যান ‘অতিরিক্ত দায়িত্ব’ বা ‘ঝামেলা’। ব্যস্ততা, চাকরি, সামাজিক মর্যাদা কিংবা ব্যক্তিগত জীবনের অজুহাতে মায়ের প্রতি দায়িত্ব ভুলে যাওয়া যেন স্বাভাবিক হয়ে উঠছে।
শিক্ষা মানুষের জ্ঞান বাড়ায়, কিন্তু মানবিকতা না থাকলে সেই শিক্ষা অসম্পূর্ণ। একজন যুগ্ম-সচিব, একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক কিংবা একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হওয়া নিঃসন্দেহে গর্বের বিষয়। কিন্তু একজন ভালো সন্তান হতে না পারলে সেই অর্জনের মহিমা অনেকটাই ম্লান হয়ে যায়। কারণ মানুষের প্রকৃত পরিচয় তার পদবিতে নয়, তার আচরণে।
আমাদের সমাজে বৃদ্ধাশ্রমের সংখ্যা বাড়ছে, একাকী বৃদ্ধ-বৃদ্ধার সংখ্যাও বাড়ছে। এটি শুধু পারিবারিক নয়, সামাজিক ও নৈতিক সংকট। পরিবারে সন্তানদের ছোটবেলা থেকেই বাবা-মায়ের প্রতি দায়িত্ববোধ, সম্মান ও ভালোবাসার শিক্ষা দিতে হবে। ধর্মীয়, নৈতিক এবং সামাজিক মূল্যবোধকে জীবনের অংশ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।
মায়ের প্রতি ভালোবাসা কেবল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘মা দিবসের’ পোস্ট দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। প্রকৃত ভালোবাসা হলো তার খোঁজ নেওয়া, তার পাশে থাকা, তার একাকীত্ব দূর করা এবং জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তাকে সম্মান ও যত্ন দেওয়া।
সাম্প্রতিক এই মর্মান্তিক ঘটনা আমাদের জন্য একটি সতর্কবার্তা। এটি মনে করিয়ে দেয় যে অর্থ, শিক্ষা ও সামাজিক মর্যাদা কখনোই মানবিকতার বিকল্প হতে পারে না। একজন মায়ের চোখের জল, তার নিঃসঙ্গতা কিংবা তার অবহেলিত জীবন কোনো সভ্য সমাজের পরিচয় হতে পারে না।
আসুন, আমরা নিজেদের কাছে একটি প্রশ্ন করি—আমাদের সাফল্যের পেছনে যিনি সবচেয়ে বড় অবদান রেখেছেন, সেই মায়ের জন্য আমরা কী করছি? কারণ পৃথিবীতে এমন কোনো অর্জন নেই, যা মায়ের দোয়া ও ভালোবাসার চেয়ে বড় হতে পারে।
লেখক- এ কে এম জুনাইদ, চেয়ারম্যান, সনি বাংলা মাল্টিমিডিয়া লিমিটেড








