মুসলিম বিশ্বের অবিসংবাদিত নেতা ছিলেন শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান
লেখক- এ কে এম জুনাইদ


মুসলিম বিশ্বের অবিসংবাদিত নেতা ছিলেন শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান
বাংলাদেশের স্বাধীনতা-পরবর্তী ইতিহাসে যেসব নেতার নাম গভীর শ্রদ্ধা ও গুরুত্বের সঙ্গে উচ্চারিত হয়, তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন Ziaur Rahman। তিনি শুধু একজন রাষ্ট্রনায়কই ছিলেন না, বরং মুসলিম বিশ্বের একজন দূরদর্শী ও প্রভাবশালী নেতা হিসেবেও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিশেষ মর্যাদা অর্জন করেছিলেন। তাঁর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, কূটনৈতিক দক্ষতা, জাতীয়তাবাদী দর্শন এবং মুসলিম উম্মাহর ঐক্যের প্রতি দৃঢ় অবস্থান তাঁকে বিশ্ব মুসলিম নেতাদের কাতারে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়।
শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে একজন বীর সেনানায়ক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। ১৯৭১ সালের ২৭ মার্চ চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করে তিনি দেশের মানুষকে মুক্তিযুদ্ধে উদ্বুদ্ধ করেন। যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে যখন দেশ রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক সংকট ও আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতার মধ্যে ছিল, তখন জিয়াউর রহমান নেতৃত্ব গ্রহণ করে বাংলাদেশকে নতুন পথে এগিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেন।
রাষ্ট্র পরিচালনায় তাঁর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করা। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, একটি নবীন রাষ্ট্রের উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতার জন্য আন্তর্জাতিক সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই তিনি “সকলের সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে বৈরিতা নয়” নীতিকে কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করেন। তাঁর নেতৃত্বে বাংলাদেশ মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক স্থাপন করতে সক্ষম হয়।
বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক উন্নয়নে জিয়াউর রহমান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাঁর সময়েই সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, কাতারসহ বিভিন্ন মুসলিম দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক শক্তিশালী হয়। এর ফলে বাংলাদেশের শ্রমবাজার মধ্যপ্রাচ্যে সম্প্রসারিত হয় এবং দেশের অর্থনীতিতে বৈদেশিক রেমিট্যান্স গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে শুরু করে।
Organisation of Islamic Cooperation বা ওআইসিতে বাংলাদেশের ভূমিকা জোরদার করতেও জিয়াউর রহমান বিশেষ ভূমিকা রাখেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, মুসলিম বিশ্বের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ঐক্য বিশ্ব শান্তি ও উন্নয়নের জন্য অত্যন্ত জরুরি। তাঁর কূটনৈতিক উদ্যোগের ফলে বাংলাদেশ মুসলিম দেশগুলোর কাছে একটি গ্রহণযোগ্য ও মর্যাদাপূর্ণ রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।
শুধু কূটনীতিই নয়, জিয়াউর রহমান দেশের অভ্যন্তরেও ইসলামী মূল্যবোধ ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করেন। তিনি বাংলাদেশের সংবিধানে “বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম” সংযোজন করেন এবং দেশের জনগণের ধর্মীয় অনুভূতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল রাষ্ট্রনীতি গড়ে তোলেন। এর মাধ্যমে তিনি দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগোষ্ঠীর আত্মপরিচয় ও সাংস্কৃতিক চেতনাকে রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি দেন।
জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক দর্শনের মূল ভিত্তি ছিল বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ। তিনি মনে করতেন, বাংলাদেশের মানুষের নিজস্ব ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ধর্মীয় মূল্যবোধের সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী জাতীয় পরিচয় গড়ে উঠতে পারে। তাঁর এই দর্শন দেশের জনগণের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলে এবং জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
অর্থনৈতিক উন্নয়নেও তাঁর অবদান ছিল অসাধারণ। তিনি কৃষি, শিল্প ও গ্রামীণ উন্নয়নে যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। “খাল খনন কর্মসূচি”, গ্রাম সরকার ব্যবস্থা, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি এবং বেসরকারি খাতকে উৎসাহ প্রদানের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিকে গতিশীল করেন। তাঁর সময়েই বাংলাদেশ খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতার পথে অগ্রসর হতে শুরু করে।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে জিয়াউর রহমান ছিলেন একজন সাহসী ও স্পষ্টভাষী নেতা। তিনি ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নেন এবং মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন সংকটে বাংলাদেশকে সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত করেন। তাঁর নেতৃত্বে বাংলাদেশ তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর মধ্যেও একটি মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান অর্জন করে।
১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে এক সামরিক অভ্যুত্থানে শহিদ হন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। তাঁর মৃত্যু বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক গভীর শূন্যতা সৃষ্টি করে। কিন্তু মৃত্যুর পরও তাঁর জনপ্রিয়তা ও আদর্শ আজও কোটি মানুষের হৃদয়ে জীবন্ত রয়েছে। বাংলাদেশের উন্নয়ন, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা এবং মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে তাঁর অবদান ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
বর্তমান সময়েও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, জিয়াউর রহমান ছিলেন এমন একজন নেতা যিনি বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থকে আন্তর্জাতিক মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে সফলভাবে সংযুক্ত করতে পেরেছিলেন। তাঁর দূরদর্শী নেতৃত্ব বাংলাদেশের কূটনীতিকে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দেয় এবং মুসলিম বিশ্বে দেশের মর্যাদা বৃদ্ধি করে।
শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান শুধু বাংলাদেশের একজন রাষ্ট্রপতি ছিলেন না; তিনি ছিলেন একটি আদর্শ, একটি দর্শন এবং মুসলিম বিশ্বের ঐক্যের প্রতীক। তাঁর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, দেশপ্রেম এবং ইসলামী বিশ্বের প্রতি আন্তরিকতা তাঁকে মুসলিম বিশ্বের অবিসংবাদিত নেতাদের একজন হিসেবে ইতিহাসে অমর করে রেখেছে।
লেখক- এ কে এম জুনাইদ
সাংবাদিক ও কলামিস্ট-
চেয়ারম্যান
সনি বাংলা মাল্টিমিডিয়া লিমিটেড








