হিজরি নববর্ষ ১৪৪৮: নতুন বছর এল, জাগল কি মুসলিম উম্মাহ?-এ কে এম জুনাইদ


নতুন একটি হিজরি বছর আমাদের দ্বারে কড়া নাড়ছে। ১৪৪৭ হিজরির অধ্যায় শেষ করে মুসলিম উম্মাহ প্রবেশ করছে ১৪৪৮ হিজরিতে। প্রতি বছর মুহাররম মাসের চাঁদ দেখা যাওয়ার মধ্য দিয়ে শুরু হয় ইসলামী বর্ষপঞ্জির নতুন যাত্রা। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই নতুন বছর কি শুধু একটি নতুন তারিখের সূচনা, নাকি আত্মসমালোচনা, আত্মশুদ্ধি ও নতুন সংকল্প গ্রহণের এক মহামূল্যবান সুযোগ? আরও বড় প্রশ্ন—নতুন বছর এল, জাগল কি মুসলিম উম্মাহ?
হিজরি সনের সূচনা কোনো রাজা-বাদশাহর জন্মদিন বা বিজয়ের স্মৃতিকে কেন্দ্র করে নয়; বরং এটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ইসলামের ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতের স্মরণে। এই হিজরত ছিল অন্যায়ের কাছে মাথা নত না করে সত্য, ন্যায় ও আদর্শ প্রতিষ্ঠার এক অনন্য দৃষ্টান্ত। তাই হিজরি নববর্ষ আমাদের মনে করিয়ে দেয় পরিবর্তন, ত্যাগ, ধৈর্য ও আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসার শিক্ষা।
দুঃখজনক হলেও সত্য, আজ বিশ্বের বহু মুসলমান হিজরি নববর্ষের প্রকৃত তাৎপর্য সম্পর্কে সচেতন নন। ইংরেজি নববর্ষ ঘিরে যত আয়োজন, আলোচনা ও পরিকল্পনা দেখা যায়, হিজরি নববর্ষ অনেক ক্ষেত্রেই নীরবে চলে আসে এবং নীরবেই চলে যায়। অথচ একজন মুসলমানের ধর্মীয় জীবন, ইবাদত, রোজা, হজ, যাকাতসহ বহু গুরুত্বপূর্ণ আমল হিজরি ক্যালেন্ডারের সঙ্গে সম্পর্কিত।
আজ মুসলিম বিশ্ব নানা সংকটে জর্জরিত। কোথাও যুদ্ধ, কোথাও দারিদ্র্য, কোথাও বিভক্তি, আবার কোথাও নৈতিক অবক্ষয় সমাজকে গ্রাস করছে। প্রযুক্তির উৎকর্ষের এই যুগে তথ্যের অভাব নেই, কিন্তু সত্যিকার জ্ঞান, মূল্যবোধ ও আত্মসমালোচনার চর্চা দিন দিন কমে যাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ব্যয় হলেও নিজের ঈমান, চরিত্র ও সমাজের প্রতি দায়িত্ব নিয়ে ভাবার সময় যেন অনেকের নেই।
হিজরি নববর্ষ আমাদের একটি মৌলিক প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়—গত এক বছরে আমরা কী অর্জন করেছি? আল্লাহর সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক কতটা দৃঢ় হয়েছে? পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতি আমাদের দায়িত্ব কতটা পালন করেছি? অন্যায়, দুর্নীতি, মিথ্যা, হিংসা ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে আমরা কতটা সোচ্চার হতে পেরেছি? যদি এসব প্রশ্নের উত্তর ইতিবাচক না হয়, তবে নতুন বছর কেবল ক্যালেন্ডারের সংখ্যা পরিবর্তন ছাড়া আর কিছুই নয়।
ইসলাম ব্যক্তি ও সমাজ—উভয়ের পরিবর্তনের শিক্ষা দেয়। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন, কোনো জাতি নিজেকে পরিবর্তন না করলে আল্লাহও তাদের অবস্থা পরিবর্তন করেন না। তাই হিজরি নববর্ষ হতে পারে আত্মশুদ্ধি ও ইতিবাচক পরিবর্তনের এক নতুন সূচনা। ব্যক্তিগত জীবনে নিয়মিত নামাজ, কোরআন অধ্যয়ন, সততা, ন্যায়পরায়ণতা ও মানবিকতা প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকারই হতে পারে নতুন বছরের সবচেয়ে বড় সংকল্প।
বিশ্ব মুসলিম উম্মাহর সামনে আজ ঐক্যের প্রশ্নও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভাষা, বর্ণ, অঞ্চল বা মতের পার্থক্য থাকলেও ঈমানের বন্ধনে মুসলমানরা একটি জাতি। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বিভক্তি ও পরস্পরের প্রতি অসহিষ্ণুতা অনেক ক্ষেত্রে আমাদের শক্তিকে দুর্বল করে দিয়েছে। হিজরতের শিক্ষা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, একটি আদর্শ সমাজ গড়তে পারস্পরিক সহযোগিতা, ভ্রাতৃত্ব ও ন্যায়বিচার অপরিহার্য।
যুবসমাজের ভূমিকা এখানে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তারাই আগামী দিনের নেতৃত্ব দেবে। যদি তারা ইসলামের জ্ঞান, নৈতিকতা ও আধুনিক দক্ষতায় সমৃদ্ধ হয়, তবে একটি আলোকিত সমাজ গঠন সম্ভব। কিন্তু যদি তারা শুধু বিনোদন, ভোগবাদ ও ক্ষণস্থায়ী জনপ্রিয়তার পেছনে ছুটে, তবে সমাজ তার প্রকৃত সম্ভাবনা হারাবে। তাই হিজরি ১৪৪৮ হোক তরুণদের জন্য জ্ঞান, সৃজনশীলতা ও মানবকল্যাণে আত্মনিয়োগের নতুন অঙ্গীকার।
পরিবারও হতে পারে এই পরিবর্তনের সূতিকাগার। সন্তানদের হিজরি মাসগুলোর পরিচয়, ইসলামের ইতিহাস এবং মহানবী (সা.)-এর জীবনাদর্শ সম্পর্কে শিক্ষা দেওয়া প্রতিটি অভিভাবকের দায়িত্ব। ঘরে ঘরে যদি ইসলামী মূল্যবোধের চর্চা বাড়ে, তবে সমাজেও তার ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
হিজরি নববর্ষ কোনো জাঁকজমকপূর্ণ উৎসবের নাম নয়; এটি সময়ের প্রবাহে নিজের অবস্থান মূল্যায়নের একটি উপলক্ষ। প্রতিটি নতুন বছর আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে জীবনের একটি বছর কমে গেল এবং মহান রবের সামনে হিসাব দেওয়ার সময় আরও কাছে চলে এলো। তাই এই বছরটি হোক আত্মপরিবর্তনের বছর, নৈতিক জাগরণের বছর এবং মানবকল্যাণে নিবেদিত জীবনের বছর।
১৪৪৮ হিজরির প্রারম্ভে আমাদের প্রত্যাশা—মুসলিম উম্মাহ কেবল অতীতের গৌরবগাথা স্মরণ করেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং জ্ঞান, ন্যায়, সততা, গবেষণা, প্রযুক্তি, মানবিকতা ও আল্লাহভীতির সমন্বয়ে একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ নির্মাণে এগিয়ে যাবে। ব্যক্তি থেকে পরিবার, পরিবার থেকে সমাজ এবং সমাজ থেকে রাষ্ট্র—সর্বত্র ইতিবাচক পরিবর্তনের ঢেউ ছড়িয়ে পড়ুক।
নতুন বছর এসেছে। এখন প্রশ্নটি আমাদের প্রত্যেকের কাছে—জাগল কি মুসলিম উম্মাহ, নাকি আমরা এখনও উদাসীনতার ঘোরে সময়কে হারিয়ে যেতে দিচ্ছি? উত্তরটি খুঁজে বের করার দায়িত্ব আমাদের সবার। হিজরি ১৪৪৮ হোক আত্মজাগরণ, ঐক্য এবং কল্যাণময় পরিবর্তনের এক নতুন অধ্যায়।








