অবসর নিয়েছেন নাবিক-সৈনিক, দায়িত্ব কি অবসর নিয়েছে?- শামস উদ্দিন শাহিন
পেনশন মঞ্জুরি ও পুনঃস্থাপনে ভোগান্তি কমাতে প্রয়োজন মানবিক ও ডিজিটাল ব্যবস্থা


ইদানীং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অবসরপ্রাপ্ত সহকর্মীদের অবসর-পরবর্তী পেনশন মঞ্জুরি কিংবা পেনশন পুনঃস্থাপন নিয়ে নানা ধরনের ভোগান্তির কথা চোখে পড়ছে। দীর্ঘ চাকরিজীবন শেষে একজন অবসরপ্রাপ্ত নাবিক বা সৈনিক যখন নিজের প্রাপ্য পেনশনের জন্য এক অফিস থেকে আরেক অফিসে ছুটে বেড়ান, তখন বিষয়টি নিছক প্রশাসনিক জটিলতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে একজন প্রবীণ মানুষের সম্মান, সময়, শারীরিক সক্ষমতা এবং দীর্ঘ কর্মজীবনের প্রতি রাষ্ট্রের স্বীকৃতির প্রশ্ন।
আমি নিজেও এসব প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে গিয়েছি। এখন কিছুটা থিতু হয়েছি। তাই ‘নেই কাজ তো খই ভাজ’ অবস্থায় আমার কিছু ভাবনা শেয়ার করছি। আমি কোনো বিশেষজ্ঞ নই—একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে বিষয়টি দেখছি। কারও মতের সঙ্গে না মিললে অনুগ্রহ করে বকাঝকা বা গালাগালি না করে বিষয়টিকে আলোচনার জায়গা হিসেবে দেখবেন।
৩০ বছর আগে যে তরুণটি ইউনিফর্ম পরেছিল
আজ থেকে ৩০ বা ৩৫ বছর আগে কোনো একদিন ১৮-২০ বছরের এক টগবগে তরুণ হয়তো জেলা সার্কিট হাউসের মাঠে কিংবা নির্ধারিত নিয়োগকেন্দ্রে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়েছিল।
কাঁধে ছিল দেশপ্রেম, চোখে ছিল স্বপ্ন—দেশের জন্য কিছু করার স্বপ্ন। ইউনিফর্ম পরবে, শৃঙ্খলাবদ্ধ জীবনে নিজেকে গড়ে তুলবে এবং দেশের সেবায় নিজের যৌবন উৎসর্গ করবে—এই ছিল তার প্রত্যাশা।
বাছাই, যাচাই-বাছাই ও প্রশিক্ষণের দীর্ঘ প্রক্রিয়া শেষে সে যোগ দিল বাংলাদেশ সেনা, নৌ বা বিমান বাহিনীতে। সিভিল জীবনের অনেক স্বাভাবিক অভ্যাস পেছনে ফেলে শুরু হলো কঠোর শৃঙ্খলা, দায়িত্ব, সততা ও দেশসেবার জীবন।
তারপর কেটে গেল বছরের পর বছর।
ঝড়-বৃষ্টি, কনকনে শীত, প্রচণ্ড গরম, রাতের পর রাত জেগে দায়িত্ব পালন—সবকিছুই ছিল চাকরিজীবনের অংশ। কেউ পদোন্নতি পেয়েছেন, কেউ পাননি। কেউ দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালন করেছেন, কেউ নির্ধারিত র্যাংক সার্ভিস পূর্ণ করে অবসরে গেছেন।
তবে একটি জায়গায় সবাই এক—ইউনিফর্ম খুলে ফেললেও দেশের প্রতি দায়িত্ববোধ খুলে ফেলা যায় না।
অবসরের পর শুরু হয় নতুন এক দৌড়
কিন্তু অবসরের পর যখন সেই মানুষটিই একজন পেনশনার হিসেবে কোনো সরকারি অফিসের দরজায় দাঁড়ান, তখন কখনো কখনো তাঁর মনে প্রশ্ন জাগে—
“আমি কি সত্যিই সেই মানুষ, যে এত বছর রাষ্ট্রের জন্য দায়িত্ব পালন করেছি? নাকি আজ আমাকে নতুন করে প্রমাণ করতে হবে যে আমি সেই মানুষটি?”
এখানেই শুরু হয় নানা ধরনের কাগজপত্র সংগ্রহ, সত্যায়ন, পুনরায় যাচাই এবং একাধিক দপ্তরে যাতায়াতের প্রক্রিয়া।
২৮-৩০ বছর পর আবার কাবিননামা কেন?
ধরা যাক, একজন নাবিক বা সৈনিক ২৮-৩০ বছর চাকরি করেছেন।
চাকরিতে যোগদানের সময় তাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতা, পরিচয় ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় নথি যাচাই করা হয়েছে। বিয়ের সময় কর্তৃপক্ষের অনুমতি নেওয়া হয়েছে। বিবাহ-সংক্রান্ত সুবিধা পেতে কাবিননামা জমা দেওয়া হয়েছে।
সন্তান জন্মের পর তাঁদের জন্মনিবন্ধন, নাগরিক সনদ, শিক্ষাগত তথ্যসহ প্রয়োজনীয় নথিও বিভিন্ন সময়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জমা হয়েছে।
সন্তানের শিক্ষা, বৃত্তি কিংবা অন্যান্য সুবিধা গ্রহণের সময়ও এসব তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে।
অর্থাৎ, একজন নাবিক বা সৈনিকের দীর্ঘ চাকরিজীবনে তাঁর ব্যক্তিগত ও পারিবারিক তথ্যের একটি পূর্ণাঙ্গ রেকর্ড সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কাছে থাকার কথা।
তারপর অবসরের সময় যদি বলা হয়—
“কাবিননামা দেন।”
পেনশনার স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন করতে পারেন—
“স্যার, কাবিননামা তো প্রায় ৩০ বছর আগে আপনাদের কাছেই জমা দিয়েছিলাম।”
উত্তর যদি হয়—
“আবার লাগবে, এটাই নিয়ম।”
তাহলে একজন প্রবীণ পেনশনারের মনে প্রশ্ন জাগতেই পারে—
“আমি কি এত বছর বিবাহিত ছিলাম, নাকি এখন অফিসকে নতুন করে প্রমাণ করতে হবে যে সত্যিই আমার বিয়ে হয়েছিল?”
বিষয়টি হাস্যরসের মনে হলেও বাস্তবে এটি একজন বয়স্ক মানুষের জন্য বেশ কষ্টকর অভিজ্ঞতা হতে পারে।
একই তথ্য বারবার কেন?
চাকরিতে নিয়োগের সময় কাগজ যাচাই হয়েছে।
বিয়ের সময় কাগজ যাচাই হয়েছে।
সন্তানের তথ্য সংযুক্ত করার সময় কাগজ যাচাই হয়েছে।
শিক্ষা ও বিভিন্ন সুবিধা গ্রহণের সময় কাগজ যাচাই হয়েছে।
অবসরের সময় আবার একই তথ্যের কাগজ চাওয়া হচ্ছে।
তখন মনে হয়, আমাদের প্রশাসনিক ব্যবস্থার অলিখিত মূলমন্ত্র যেন—
“বিশ্বাস করব কেন? কাগজ কোথায়?”
নাগরিক কাগজ বের করে দিলে আবার প্রশ্ন আসে—
“সত্যায়িত কপি কোথায়?”
সত্যায়িত কপি দিলে বলা হয়—
“এটা পুরোনো, নতুন কপি আনুন।”
নতুন কপি নিয়ে এলে হয়তো বলা হয়—
“আরেকটি নথি প্রয়োজন।”
এভাবে একজন পেনশনারের কাছে পুরো প্রক্রিয়াটি কখনো কখনো এমন মনে হতে পারে—
“আমি কি পেনশন নিতে এসেছি, নাকি আবার নতুন করে চাকরিতে যোগ দিতে এসেছি?”
তথ্য যখন অফিসের, ভোগান্তি কেন নাগরিকের?
এখানেই মূল প্রশ্ন।
একটি প্রতিষ্ঠান যদি দীর্ঘদিন ধরে একজন কর্মীর ব্যক্তিগত, চাকরি ও পারিবারিক তথ্য সংরক্ষণ করে থাকে, তাহলে অবসরের সময় একই তথ্য পুনরায় সংগ্রহের প্রয়োজন কতটা?
অবশ্যই কোনো তথ্য আইনগত বা প্রশাসনিক কারণে পুনরায় যাচাইয়ের প্রয়োজন হতে পারে। সেটি অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু সেই যাচাইয়ের পুরো দায়িত্ব যদি একজন প্রবীণ বা অসুস্থ পেনশনারের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়, তখন মানবিক দিকটি বিবেচনা করা জরুরি।
বিশেষ করে অবসরপ্রাপ্ত সামরিক সদস্যদের অনেকেই বয়সের ভার, শারীরিক অসুস্থতা ও সীমিত আয়ের মধ্যে জীবনযাপন করেন। তাঁদের জন্য এক অফিস থেকে অন্য অফিসে বারবার যাওয়া শুধু যাতায়াতের খরচ নয়—এটি শারীরিক শক্তি, সময় এবং মানসিক শান্তিরও ব্যয়।
ডিজিটাল যুগে সমাধান সম্ভব
বর্তমান ডিজিটাল যুগে এ সমস্যার অনেকটাই সমাধান করা সম্ভব।
একজন সামরিক সদস্যের চাকরিজীবনে জমা দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ নথির একটি Verified Digital Service Record বা যাচাইকৃত ডিজিটাল সার্ভিস রেকর্ড থাকতে পারে।
চাকরির শুরু থেকে অবসর পর্যন্ত তাঁর গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও নথি একটি নিরাপদ ডিজিটাল সিস্টেমে সংরক্ষিত থাকবে। অবসরের সময় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা প্রয়োজনীয় তথ্য সিস্টেম থেকেই যাচাই করতে পারবেন।
তখন পেনশনারকে বলা হবে না—
“কাগজ নিয়ে আসেন।”
বরং অফিস বলতে পারবে—
“আপনার রেকর্ড আমাদের সিস্টেমে আছে। আমরা যাচাই করে নিচ্ছি।”
ডিজিটাল রাষ্ট্রব্যবস্থার উদ্দেশ্য তো মানুষের কাজ সহজ করা—মানুষকে আরও বেশি কাগজের বোঝা দেওয়া নয়।
পেনশনার ভিক্ষুক নন
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—একজন অবসরপ্রাপ্ত নাবিক বা সৈনিক তাঁর পেনশন চাইতে কারও কাছে দয়া চাইতে যান না।
তিনি তাঁর অর্জিত অধিকার নিতে যান।
পেনশন কোনো অনুদান বা দয়া নয়। এটি দীর্ঘ চাকরিজীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি প্রাপ্য সুবিধা।
তাই একজন অবসরপ্রাপ্ত মানুষ যখন কোনো অফিসে যান, তাঁর সঙ্গে আচরণের ভাষাটিও হওয়া উচিত মানবিক।
একজন কর্মকর্তা যদি বলেন—
“আপনি আমাদের সাবেক সহকর্মী। কীভাবে আপনাকে সহযোগিতা করতে পারি?”
এই একটি বাক্যই হয়তো একজন প্রবীণ মানুষের অনেক কষ্ট কমিয়ে দিতে পারে।
কারণ অনেক অবসরপ্রাপ্ত সদস্যের কাছে সম্মান কখনো কখনো অর্থের চেয়েও বড় বিষয়।
রাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধে ব্যক্তি কখনো জিততে পারে না
একজন পেনশনার একজন ব্যক্তি। অন্যদিকে তাঁর সামনে থাকে একটি বিশাল প্রশাসনিক কাঠামো—অফিস, ফাইল, বিধি, উপবিধি, ডেস্ক, কাউন্টার, স্বাক্ষর, সিল, নোটশিট এবং এক ডেস্ক থেকে আরেক ডেস্কে যাওয়ার দীর্ঘ প্রক্রিয়া।
ব্যক্তির হাতে হয়তো থাকে একটি ফাইল, একটি লাঠি এবং বহুদিনের পুরোনো এক জোড়া জুতা।
অন্যদিকে প্রতিষ্ঠানের হাতে থাকে পুরো প্রশাসনিক কাঠামো।
তাই একজন প্রবীণ পেনশনারকে বারবার ঘোরানো শুধু সময়ের অপচয় নয়; এটি তাঁর শারীরিক কষ্ট, মানসিক চাপ এবং আত্মসম্মানের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
কীভাবে ভোগান্তি কমানো যায়?
পেনশনারদের হয়রানি ও অপ্রয়োজনীয় দৌড়ঝাঁপ কমাতে কয়েকটি উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে—
১. একবার যাচাইকৃত তথ্য পুনরায় অপ্রয়োজনীয়ভাবে না চাওয়া।
আগের অফিসিয়াল রেকর্ডকে প্রাথমিক ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে।
২. প্রত্যেক সদস্যের পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল সার্ভিস রেকর্ড তৈরি করা।
৩. চাকরিজীবনে যাচাই করা নথির ডিজিটাল কপি সংরক্ষণ করা।
৪. কোনো নথি প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট অফিসের নিজস্ব রেকর্ড থেকে তা সংগ্রহের ব্যবস্থা করা।
৫. প্রবীণ ও অসুস্থ পেনশনারদের জন্য আলাদা Pension Help Desk চালু করা।
৬. পেনশন-সংক্রান্ত আবেদন নিষ্পত্তির নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করা।
৭. অপ্রয়োজনীয় হয়রানি বা বিলম্বের বিরুদ্ধে সহজ অভিযোগ ব্যবস্থা রাখা।
সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হওয়া উচিত মানসিকতায়।
“Citizen has to prove”—অর্থাৎ নাগরিককেই বারবার প্রমাণ করতে হবে—এই সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে “Office verifies”—অর্থাৎ অফিস নিজস্ব রেকর্ড থেকে যাচাই করবে—এই সংস্কৃতিতে যেতে হবে।
জুতোর সুখতলা যেন আর না ক্ষয় হয়
একজন নাবিক বা সৈনিক যখন চাকরিতে প্রবেশ করেছিলেন, তখন তাঁর হাতে ছিল তারুণ্য, শক্তি আর স্বপ্ন।
অবসরে এসে সেই হাতেই থাকে পেনশনের কাগজ, চিকিৎসার প্রেসক্রিপশন এবং জীবনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা।
তাঁর জুতোর সুখতলা তখন হয়তো অনেকটাই ক্ষয়ে গেছে।
রাষ্ট্রের দরজায় এসে যেন তাঁর জুতোর সুখতলাটুকুও শেষ করে দিতে না হয়।
কারণ—
নাবিক বা সৈনিক অবসর নিয়েছেন, দেশসেবা অবসর নেয়নি।
ইউনিফর্ম খুলেছেন, অধিকার খুলে রাখেননি।
বয়স বেড়েছে, কিন্তু আত্মসম্মানের বয়স বাড়েনি।
রাষ্ট্র যদি তার প্রবীণ সেবকদের জন্য সামান্য পথটুকু সহজ করে দেয়, সেটি কোনো অনুগ্রহ হবে না।
এটি হবে রাষ্ট্রের নিজের মানুষের প্রতি রাষ্ট্রের দায়িত্ববোধের প্রকাশ।
একজন অবসরপ্রাপ্ত নাবিক বা সৈনিকের পেনশনপ্রাপ্তির পথ যত সহজ হবে, রাষ্ট্রের মানবিক মুখ তত স্পষ্ট হবে।
আর শেষ পর্যন্ত আমাদের মনে রাখা উচিত—
“যে মানুষটি জীবনের সেরা সময় রাষ্ট্রকে দিয়েছেন, অবসরের পর রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো তাঁর প্রাপ্য সম্মান ও অধিকারটুকু সহজ করে দেওয়া।”
লেখক-সিনিয়র ওয়ারেন্ট অফিসার (অবঃ) শামস উদ্দিন শাহিন , বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ।








