রামিসা থেকে অপ্রতীম—কোন দিকে যাচ্ছে বাংলাদেশ — এ কে এম জুনাইদ
আমরা কোন দিকে যাচ্ছি?


একটি শিশুর নাম রামিসা। আরেকটি কিশোরের নাম ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতীম। দুটি আলাদা ঘটনা, দুটি আলাদা পরিবার, দুটি আলাদা সময়—কিন্তু তাদের গল্পের ভেতর যেন একই প্রশ্ন বারবার ফিরে আসে: আমরা কোন দিকে যাচ্ছি?
সম্প্রতি রামিসা হত্যাকাণ্ডের দ্রুত বিচার নিয়ে আলোচনা শেষ হতে না হতেই কুমিল্লায় ১৩ বছর বয়সী কিশোর ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতীম হত্যাকাণ্ড দেশবাসীকে আবারও নাড়িয়ে দিয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, রামিসা হত্যার বিচারের মতো অপ্রতীম হত্যার বিচারও দ্রুত শেষ করার বিষয়ে সরকার সহযোগিতা করবে।
একজন সাংবাদিক হিসেবে, একজন নাগরিক হিসেবে এবং সর্বোপরি একজন মানুষ হিসেবে এই ঘটনাগুলো আমাদের সামনে শুধু অপরাধের প্রশ্ন নয়, সমাজের ভবিষ্যৎ নিয়েও বড় প্রশ্ন দাঁড় করায়।
একটি শিশুর নিরাপত্তা যদি নিশ্চিত করতে না পারি, তাহলে উন্নয়নের অর্থ কী?
বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে এগিয়েছে—এ কথা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু উন্নয়ন শুধু সেতু, রাস্তা, ভবন, মেট্রোরেল কিংবা জিডিপির পরিসংখ্যান দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। উন্নয়নের সবচেয়ে বড় সূচক হলো মানুষ কতটা নিরাপদ, শিশু কতটা সুরক্ষিত, নারী কতটা মর্যাদার সঙ্গে চলতে পারেন এবং একজন সাধারণ নাগরিক কতটা ন্যায়বিচারের ওপর আস্থা রাখতে পারেন।
আজ আমাদের সামনে সেই মানবিক উন্নয়নের প্রশ্নটি ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
অপরাধ কি শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা?
অপ্রতীম হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মাদক ও জুয়ার সংশ্লিষ্টতার কথা উল্লেখ করে সামাজিক ও মোটিভেশনাল কার্যক্রম বাড়ানো এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড জোরদারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি এটিও বলেছেন যে সমাজে নৈতিক অবক্ষয়ের বিভিন্ন লক্ষণ দীর্ঘদিন ধরে দেখা যাচ্ছে।
এই বক্তব্যের ভেতরে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা রয়েছে। অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর পুলিশ গ্রেপ্তার করবে, তদন্ত করবে, আদালতে মামলা যাবে—এটাই স্বাভাবিক বিচারিক প্রক্রিয়া। কিন্তু অপরাধ কমাতে হলে আমাদের যেতে হবে আরও গভীরে।
একজন কিশোর কেন অপরাধে জড়ায়?
কেন একজন তরুণের কাছে মাদক বা জুয়া বিনোদনের মাধ্যম হয়ে ওঠে?
কেন দ্রুত অর্থ উপার্জনের লোভ কখনো কখনো মানুষের জীবন থেকেও বড় হয়ে যায়?
কেন পারিবারিক বন্ধন, সামাজিক মূল্যবোধ এবং শিক্ষার পাশাপাশি সহমর্মিতা ও নৈতিকতার চর্চা দুর্বল হয়ে পড়ছে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর শুধু থানায় পাওয়া যাবে না। উত্তর খুঁজতে হবে পরিবারে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, সমাজে, রাষ্ট্রীয় নীতিতে এবং আমাদের সংস্কৃতির ভেতর।
বিচার দ্রুত হওয়া জরুরি, কিন্তু বিচারই শেষ কথা নয়
অপ্রতীম হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় পুলিশের দ্রুত তৎপরতা ও সন্দেহভাজনদের গ্রেপ্তারের বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। তদন্তে ফরেনসিক বিশ্লেষণসহ আইনানুগ প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি—দ্রুত বিচার মানে তাড়াহুড়ো করে বিচার নয়। দ্রুত বিচার হতে হবে ন্যায়বিচারের পূর্ণ নিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে। তদন্ত হবে নিরপেক্ষ, প্রমাণ হবে নির্ভরযোগ্য, আসামির আইনি অধিকার থাকবে এবং আদালতের সিদ্ধান্ত হবে স্বাধীন বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে।
একই সঙ্গে অপরাধের শিকার পরিবারকে দীর্ঘদিন আদালত, থানা ও প্রশাসনের দরজায় ঘুরতে না হয়—সেটিও রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
একজন বাবা যখন সন্তান হারান, একজন মা যখন তার সন্তানকে হারান, তখন শুধু একটি মামলা নয়—একটি পরিবার ভেঙে যায়। রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু আসামিকে শাস্তি দেওয়া নয়; ভুক্তভোগী পরিবারকে ন্যায়বিচারের পথটিও মানবিক ও সহজ করা।
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ আমাদের তরুণ প্রজন্ম
বাংলাদেশের জনসংখ্যার বড় একটি অংশ তরুণ। এই তরুণরাই দেশের ভবিষ্যৎ অর্থনীতি, প্রশাসন, ব্যবসা, প্রযুক্তি, গণমাধ্যম ও রাজনীতির নেতৃত্ব দেবে।
কিন্তু তরুণদের সামনে যদি শিক্ষা ও দক্ষতার পরিবর্তে মাদক, জুয়া, বেকারত্ব, হতাশা, সহিংসতা এবং অপরাধের সংস্কৃতি ক্রমশ দৃশ্যমান হয়ে ওঠে, তাহলে সেটি শুধু ব্যক্তিগত বিপর্যয় নয়—জাতীয় ঝুঁকি।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার ২০২৬ সালের বিশ্লেষণেও বাংলাদেশের শ্রমবাজারে অনানুষ্ঠানিক কর্মসংস্থান, অপূর্ণ কর্মসংস্থান, প্রকৃত মজুরি ও তরুণদের সুযোগের মতো সমস্যাগুলোকে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
তাই তরুণদের হাতে শুধু স্মার্টফোন তুলে দিলেই হবে না; দিতে হবে দক্ষতা, কর্মসংস্থান, খেলাধুলা, সংস্কৃতি, সৃজনশীলতা ও উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ।
একজন তরুণের সামনে যদি সম্মানজনক জীবনের বৈধ পথ খোলা থাকে, তাহলে অপরাধের পথ বেছে নেওয়ার সামাজিক ঝুঁকি কমানো সম্ভব।
অর্থনৈতিক চাপও সামাজিক বাস্তবতার অংশ
মানুষের জীবনে অর্থনৈতিক চাপ বাড়লে তার প্রভাব শুধু বাজারে সীমাবদ্ধ থাকে না। পরিবার, শিক্ষা, মানসিক চাপ, কর্মসংস্থান এবং সামাজিক সম্পর্ক—সবকিছুর ওপর এর প্রভাব পড়ে।
বাংলাদেশে আগস্ট ২০২৬-এ মূল্যস্ফীতি ৮.২৬ শতাংশে ছিল। বিশ্বব্যাংকও ২০২৬ সালে মূল্যস্ফীতি, ব্যাংকিং খাতের চাপ, বিনিয়োগের দুর্বলতা ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রয়োজনীয়তাকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেছে।
এর মধ্যেই ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ থেকে জ্বালানি তেলের দাম সর্বোচ্চ ১৭.৪ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। বিশ্ববাজারের তেলের দাম ও আমদানি ব্যয়ের চাপের কারণে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে সরকার জানিয়েছে। এর ফলে পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয়ের ওপর নতুন চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
অর্থনীতির এই চাপ সাধারণ মানুষের জীবনকে কঠিন করে তুলতে পারে। তাই রাষ্ট্রকে একই সঙ্গে দুটি কাজ করতে হবে—একদিকে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা, অন্যদিকে নিম্ন ও মধ্যআয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা এবং কর্মসংস্থান রক্ষা করা।
শুধু সরকার নয়, সমাজকেও বদলাতে হবে
আমরা প্রায় প্রতিটি অপরাধের পর প্রশ্ন করি—সরকার কোথায়? পুলিশ কোথায়? প্রশাসন কোথায়?
প্রশ্নগুলো অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আমাদের নিজেদের কাছেও প্রশ্ন রাখতে হবে—আমরা কোথায়?
একটি শিশু যখন রাস্তায় বিপদে পড়ে, আমরা কি সাহায্যের জন্য এগিয়ে যাই?
একজন কিশোর যখন মাদকের দিকে যাচ্ছে, পরিবার কি সময়মতো বিষয়টি বুঝতে পারে?
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকরা কি শুধু পরীক্ষার ফলাফল দেখছেন, নাকি শিক্ষার্থীর আচরণ ও মানসিক বিকাশের দিকেও নজর দিচ্ছেন?
পাড়া-মহল্লায় কি খেলাধুলার মাঠ আছে?
কিশোরদের জন্য কি সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড আছে?
অভিভাবকের সঙ্গে সন্তানের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আছে কি?
এসব প্রশ্নের উত্তর আমাদের সামাজিক বাস্তবতার আয়না।
গণমাধ্যমেরও দায়িত্ব আছে
একজন সাংবাদিক হিসেবে আমি মনে করি, অপরাধের সংবাদ প্রকাশের সময় গণমাধ্যমের দায়িত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অপরাধের খবর মানুষকে জানাতে হবে, কিন্তু অপরাধকে বিনোদনে পরিণত করা যাবে না। নিহতের পরিবারের মর্যাদা রক্ষা করতে হবে। শিশুদের পরিচয় ও ছবি ব্যবহারে দায়িত্বশীল হতে হবে। যাচাই না করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তথ্য প্রচার করা যাবে না।
একই সঙ্গে গণমাধ্যমকে শুধু হত্যাকাণ্ডের খবর প্রচার করলেই হবে না। অপরাধ প্রতিরোধের উপায়, মাদকবিরোধী কার্যক্রম, কিশোরদের মানসিক ও সামাজিক বিকাশ, শিক্ষা, খেলাধুলা এবং কর্মসংস্থানের বিষয়ও সামনে আনতে হবে।
কারণ সাংবাদিকতার লক্ষ্য শুধু ঘটনা বলা নয়—সমাজকে সচেতন করাও।
আমরা কোন বাংলাদেশ চাই?
আমরা এমন বাংলাদেশ চাই না, যেখানে সন্তান স্কুল থেকে বাড়ি ফিরবে কি না—তা নিয়ে বাবা-মাকে সারাক্ষণ আতঙ্কে থাকতে হবে।
আমরা এমন বাংলাদেশ চাই না, যেখানে একটি হত্যাকাণ্ডের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কয়েকদিন উত্তেজনা থাকবে, তারপর আরেকটি ঘটনা এসে আগের ঘটনাকে আড়াল করে দেবে।
আমরা এমন বাংলাদেশ চাই, যেখানে অপরাধ করলে দ্রুত তদন্ত হবে, ন্যায়বিচার হবে; কিন্তু একই সঙ্গে অপরাধ সংঘটনের সামাজিক কারণগুলোও চিহ্নিত করা হবে।
আমরা এমন বাংলাদেশ চাই, যেখানে পুলিশ হবে জনবান্ধব, বিচারব্যবস্থা হবে কার্যকর ও ন্যায়নিষ্ঠ, প্রশাসন হবে জবাবদিহিমূলক এবং রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলো মানুষের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেবে।
শেষ কথা
রামিসা ও অপ্রতীম—দুটি নাম আজ আমাদের বিবেকের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। তারা শুধু দুটি মামলার নাম নয়; তারা আমাদের কাছে একটি প্রশ্নের প্রতীক—আমরা আমাদের শিশু-কিশোরদের জন্য কেমন বাংলাদেশ রেখে যেতে চাই?
অপরাধের বিচার প্রয়োজন। অপরাধীর আইনের আওতায় আসা প্রয়োজন। কিন্তু তার চেয়েও প্রয়োজন এমন একটি সমাজ তৈরি করা, যেখানে অপরাধের শিকড় বিস্তার করার সুযোগ কমে আসে।
আমাদের মনে রাখতে হবে—রাষ্ট্রের শক্তি শুধু আইন প্রয়োগে নয়, মানুষের আস্থা অর্জনে। সমাজের শক্তি শুধু প্রতিবাদে নয়, প্রতিরোধে। আর একটি জাতির শক্তি শুধু অর্থনীতিতে নয়, তার মানবিকতায়।
বাংলাদেশ এখন এক পরিবর্তনশীল সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। অর্থনীতি, রাজনীতি, প্রশাসন, শিক্ষা, কর্মসংস্থান—সব ক্ষেত্রেই নতুন বাস্তবতা তৈরি হচ্ছে। এই সময়ে আমরা যদি শুধু প্রতিষ্ঠান বদলাই কিন্তু মানসিকতা না বদলাই, তাহলে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন পূর্ণতা পাবে না।
রামিসা থেকে অপ্রতীম—এই ধারাবাহিকতা যেন আর কোনো শিশুর নাম দিয়ে দীর্ঘ না হয়।
আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন বাংলাদেশ, যেখানে প্রতিটি শিশু নিরাপদে বেড়ে উঠবে, প্রতিটি তরুণ স্বপ্ন দেখবে, সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের সুযোগ পাবে এবং আইন থাকবে মানুষের পাশে।
বাংলাদেশ কোন দিকে যাবে—তার উত্তর শুধু সরকারের হাতে নয়। সেই উত্তর আমাদের প্রত্যেকের হাতে।








