শুধু পশু নয়, পশুত্বকেও কুরবানী দিতে হবে— এ কে এম জুনাইদ
আমরা যদি সত্যিই কুরবানীর শিক্ষা গ্রহণ করতে পারি, তবে সমাজ থেকে হিংসা-বিদ্বেষ, দুর্নীতি ও অন্যায় অনেকাংশে দূর হবে।


পবিত্র ঈদুল আযহা মুসলিম উম্মাহর জন্য ত্যাগ, আত্মসমর্পণ ও মানবিকতার এক মহিমান্বিত শিক্ষা। প্রতি বছর মুসলমানরা আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে পশু কুরবানী করে থাকেন। কিন্তু কুরবানীর প্রকৃত শিক্ষা কি শুধুই পশু জবাইয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ? ইসলামের দৃষ্টিতে কুরবানীর মূল উদ্দেশ্য হলো মানুষের অন্তরের পশুত্ব, হিংসা, লোভ, অহংকার ও অন্যায়ের প্রবৃত্তিকে দমন করা। তাই বলা যায়—“শুধু পশু নয়, পশুত্বকেও কুরবানী দিতে হবে।”
হযরত ইবরাহিম (আ.)-এর জীবনের মহান আত্মত্যাগের ঘটনাই কুরবানীর মূল ভিত্তি। তিনি আল্লাহর নির্দেশে নিজের সবচেয়ে প্রিয় সন্তান হযরত ইসমাইল (আ.)-কে কুরবানী করার জন্য প্রস্তুত হয়েছিলেন। এখানে মূল শিক্ষা ছিল আল্লাহর প্রতি নিঃশর্ত আনুগত্য ও আত্মসমর্পণ। আল্লাহ তাআলা মানুষের রক্ত-মাংস চান না; তিনি চান মানুষের অন্তরের তাকওয়া ও আন্তরিকতা। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন, “আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না এগুলোর গোশত ও রক্ত, বরং পৌঁছে তোমাদের তাকওয়া।”
আজকের সমাজে আমরা বাহ্যিক কুরবানী করলেও অনেক সময় অন্তরের পশুত্বকে লালন করি। হিংসা, বিদ্বেষ, দুর্নীতি, মিথ্যাচার, অন্যায়, ক্ষমতার অপব্যবহার ও মানবতার অবক্ষয় আমাদের সমাজকে গ্রাস করছে। কুরবানীর ঈদ শেষে যদি মানুষের আচরণে কোনো পরিবর্তন না আসে, তবে সেই কুরবানীর প্রকৃত শিক্ষা বাস্তবায়িত হয় না।
বর্তমান সময়ে মানুষ শিক্ষিত হচ্ছে, আধুনিক হচ্ছে, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে মানবিক মূল্যবোধ হারিয়ে ফেলছে। পরিবারে অশান্তি, সমাজে বিভেদ, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, সামাজিক অবিচার ও নৈতিক অবক্ষয় আমাদের চারপাশে স্পষ্ট। এসবই মানুষের ভেতরের পশুত্বের বহিঃপ্রকাশ। কুরবানীর প্রকৃত তাৎপর্য হলো—এই অমানবিক প্রবৃত্তিগুলোকে দমন করা এবং মানবিক গুণাবলিকে জাগ্রত করা।
কুরবানী আমাদের ত্যাগের শিক্ষা দেয়। একজন মানুষ যখন আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিজের অর্থ ব্যয় করে পশু কুরবানী করেন, তখন তিনি মূলত নিজের ভোগবাদী মানসিকতাকে নিয়ন্ত্রণের অনুশীলন করেন। একইসাথে কুরবানীর মাংস গরিব-দুঃখীদের মাঝে বণ্টনের মাধ্যমে সমাজে সাম্য ও ভ্রাতৃত্ববোধ প্রতিষ্ঠিত হয়। ইসলাম এমন একটি সমাজব্যবস্থা চায়, যেখানে ধনী-গরিবের বৈষম্য কমে আসে এবং সবাই পরস্পরের সুখ-দুঃখে অংশ নেয়।
আজ আমাদের সমাজে যে অসহিষ্ণুতা ও বিভাজন সৃষ্টি হয়েছে, তা দূর করতে কুরবানীর শিক্ষাকে বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করা অত্যন্ত জরুরি। যদি একজন মানুষ কুরবানীর মাধ্যমে নিজের অহংকার, লোভ ও স্বার্থপরতাকে ত্যাগ করতে পারেন, তবে সমাজে শান্তি ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠা সম্ভব।
কুরবানী কেবল একটি ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি আত্মশুদ্ধির এক অনন্য মাধ্যম। আমাদের প্রত্যেকের উচিত ঈদুল আযহার এই মহান শিক্ষাকে হৃদয়ে ধারণ করা। শুধু বাহ্যিক পশু কুরবানী করলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না; বরং নিজের অন্তরের পশুত্বকে কুরবানী করাই হলো প্রকৃত সফলতা।
আমরা যদি সত্যিই কুরবানীর শিক্ষা গ্রহণ করতে পারি, তবে সমাজ থেকে হিংসা-বিদ্বেষ, দুর্নীতি ও অন্যায় অনেকাংশে দূর হবে। মানুষ মানুষকে ভালোবাসতে শিখবে, সহমর্মিতা ও মানবিকতা বৃদ্ধি পাবে। তবেই কুরবানী তার প্রকৃত অর্থ ও মর্যাদা লাভ করবে।
পবিত্র ঈদুল আযহার এই শিক্ষা আমাদের ব্যক্তিজীবন, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে ছড়িয়ে পড়ুক—এই হোক আমাদের প্রত্যাশা। আসুন, আমরা শুধু পশু নয়, নিজেদের ভেতরের পশুত্বকেও কুরবানী করি। তাহলেই ঈদুল আযহার প্রকৃত সৌন্দর্য ও তাৎপর্য বাস্তবায়িত হবে।








